সময় চক্র ডিজিটাল ডেস্ক
রক্ত ও বারুদে লেখা একটি নাম ১৬ই ডিসেম্বর। বাঙালির শৌর্য, ত্যাগ এবং অদম্য সাহসের মহোৎসব। আজ থেকে কয়েক দশক আগে, ১৯৭১ সালের এই গোধূলি লগ্নে অবসান ঘটেছিল দীর্ঘ দু’শ বছরের পরাধীনতা ও ২৩ বছরের তীব্র শোষণের। ৯ মাসের রক্তনদী পেরিয়ে আসা এক ভূখণ্ডের নাম হয়েছিল ‘বাংলাদেশ’। সময় চক্রের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা ফিরে তাকাব সেই ইতিহাসের পাতায়, যা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছে।
১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলা (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) শোষণের শিকার হয়।
* ভাষা আন্দোলন (১৯৫২): পশ্চিম পাকিস্তানিরা যখন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তখন রাজপথে রক্ত দিয়ে বাঙালি তার জাতিসত্তার পরিচয় রক্ষা করেছিল।
* স্বাধিকার আন্দোলন: ৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬-র ঐতিহাসিক ছয় দফা (বাঙালির মুক্তির সনদ) এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙালি পাকিস্তান রাষ্ট্রের অসারতা প্রমাণ করে দেয়।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। এর প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই ভাষণটিই ছিল কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল দিকনির্দেশনা।
৩রা মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়। ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা শুরু করে। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু ওয়ারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন:
“আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। … পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি থেকে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান।”
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ‘জনযুদ্ধ’।
* মুজিবনগর সরকার: ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নেয়, যা যুদ্ধ পরিচালনার কাঠামো তৈরি করে।
* মুক্তিবাহিনী ও গেরিলা যুদ্ধ: ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক এবং পেশাজীবীদের নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। ক্র্যাক প্লাটুন থেকে শুরু করে নৌ-কমান্ডোদের ‘অপারেশন জ্যাকপট’—প্রতিটি অভিযানে পাকবাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে।
* আন্তর্জাতিক সমর্থন: ভারত কেবল এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়ই দেয়নি, বরং কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে সরাসরি সহযোগিতা করেছে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়।
পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) ১৪ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের—শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের হত্যা করে। জাতিকে মেধাশূন্য করার এই জঘন্য চেষ্টার ঠিক দুই দিন পর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত বিজয়।
১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১। বিকেল ৪টা ৩১ মিনিট। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যৌথবাহিনীর কমান্ডিং অফিসার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা’র কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন পাকিস্তানি জেনারেল এএকে নিয়াজি। ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য মাথা নত করে অস্ত্র সমর্পণ করে। বিশ্বের মানচিত্রে উদিত হয় লাল-সবুজের পতাকা।
* শহীদ ও ত্যাগের পরিসংখ্যান: ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হন, ২ লক্ষাধিক মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারান এবং প্রায় ১ কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
* বীরাঙ্গনা উপাধি: যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু নির্যাতিত নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত করে তাদের যথাযথ সম্মান ও পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন।
* বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: বিজয়ের পূর্ণতা আসে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি, যখন জাতির পিতা পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে প্রিয় স্বদেশে ফিরে আসেন।
বিজয় দিবস কেবল উৎসবের দিন নয়, এটি আত্মোপলব্ধি ও দায়বদ্ধতার দিন। শহীদদের রক্তে ভেজা এই মাটির মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের পরম কর্তব্য। সময় চক্র নিউজ পোর্টালের পক্ষ থেকে আমরা বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই সকল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি। তাঁদের বীরত্ব আমাদের শিখিয়েছে মাথা নোয়াবার নয়, বরং বুক চিতিয়ে লড়াই করার নামই বাংলাদেশ।









