জাতীয়তাবাদী চেতনার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত: এক নক্ষত্রের বিদায়
নিজস্ব প্রতিবেদক | সময় চক্র
ঢাকা, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি, দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য উৎসর্গকৃত এক জীবন—বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। গতকাল ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের মাধ্যমে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। তাঁর এই প্রয়াণে বাংলাদেশ কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হারালো না, হারালো এক অতন্দ্র প্রহরীকে, যিনি আমৃত্যু দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া নামটি একটি বিশ্বাসের নাম। আশির দশকের উত্তাল রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর অবিচল নেতৃত্ব তাঁকে দিয়েছিল ‘আপসহীন নেত্রী’র সম্মান। পরবর্তীতে মানুষের ভোটের অধিকার রক্ষা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে তাঁর অসামান্য ত্যাগের জন্য তিনি ভূষিত হন ‘গণতন্ত্রের মা’ উপাধিতে। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে শুরু করে গৃহবন্দিত্ব—কোনো কিছুই তাঁকে দেশ ও মানুষের অধিকারের দাবি থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
বেগম জিয়ার ইন্তেকালে জাতি আজ অভিভাবকহীন। তাঁর প্রয়াণে দেশ ও জাতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো, তা কেবল একটি শূন্যস্থান নয়, বরং একটি যুগের অবসান। তিনি ছিলেন সেই নেত্রী, যিনি বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও ভাষাকে বুঝতে পারতেন। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি কখনোই কোনো শক্তির কাছে মাথা নত করেননি। আজ তাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা আগামী বহু বছর অপূরণীয় হয়েই থাকবে।
আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। বিশেষ করে:
ছাত্রীদের উপবৃত্তি ও অবৈতনিক শিক্ষা চালুর মাধ্যমে তিনি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় এনেছিলেন।
একদলীয় শাসনের স্মৃতি মুছে ১৯৯১ সালে দেশে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার মূল কৃতিত্ব তাঁরই।
বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা এবং দেশের সীমান্ত ও স্বার্থ রক্ষায় তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিল অনন্য।
সময় চক্র পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা এই মহান নেত্রীর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর জীবনের সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম নসিব করুন। (আমিন)।
দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের হৃদয়ে তিনি অমর হয়ে থাকবেন তাঁর দেশপ্রেম ও সাহসের দৃষ্টান্ত হয়ে। যতদিন বাংলাদেশের মানচিত্র থাকবে, ততদিন ‘দেশনেত্রী’র অবদান স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
একনজরে দেশনেত্রীর মহাকাব্যিক জীবনরেখা
১৯৪৫: ১৫ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার জলপাইগুড়িতে জন্ম।
১৯৬০: তৎকালীন সেনাবাহিনী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহ।
১৯৮১: ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণ। শোকাতুর খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসার প্রেক্ষাপট তৈরি।
১৯৮২: ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ গ্রহণের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পণ।
১৯৮৪: ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত। শুরু হয় স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ লড়াই।
১৯৯১: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ। প্রবর্তন করেন সংসদীয় গণতন্ত্র।
১৯৯৩: নারী শিক্ষার প্রসারে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হন।
২০০১: বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো (পূর্ণ মেয়াদে) প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত।
২০০৮: সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং প্রতিকূলতার মাঝেও হার না মানা অবস্থান।
২০১৮: ৮ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত মামলায় কারারুদ্ধ হওয়া। দীর্ঘ বন্দিজীবনের শুরু।
২০২৪: ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর সকল মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি ও দণ্ড মওকুফ।
*২০২৫: ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিরবিদায়।









