সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় এক পল্লী চিকিৎসককে মারধর, অবরুদ্ধ করে রাখা, পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং জোরপূর্বক নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক যুবদল নেতাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সোনারগাঁও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
অভিযুক্তরা হলেন-মোগরাপাড়া ইউনিয়নের গোহাট্টা এলাকার বাসিন্দা আরিফ হোসেন বাবু (৩৫), মো. শাহীন (২৫), মো. সুমন (২৫) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আরিফ হোসেন বাবু স্থানীয় যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং মোগরাপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আতাউর রহমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
লিখিত অভিযোগ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী মো. কালাম গোহাট্টা বেলেরথলি এলাকায় একটি পল্লী চিকিৎসক ট্রেনিং সেন্টার পরিচালনা করেন। গত সোমবার (১৫ জুন) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তিনি গোহাট্টা জামে মসজিদ থেকে এশার নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় পথে আরিফ হোসেন বাবুর নেতৃত্বে কয়েকজন তাঁর পথরোধ করে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পথরোধের পর তাঁকে এলোপাতাড়িভাবে কিল-ঘুষি ও মারধর করা হয়। এতে তিনি শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরে জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে তাঁর নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস কক্ষে নিয়ে গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, অবরুদ্ধ অবস্থায় চিকিৎসক কালামের কাছে নগদ পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদার টাকা না দিলে তাঁর পরিচালিত ট্রেনিং সেন্টার স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে একটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই স্ট্যাম্পে উল্লেখ করা হয় যে, কালাম অভিযুক্তদের কাছে দুই লাখ টাকা পাওনা রয়েছেন এবং তা দুই কিস্তিতে পরিশোধ করবেন। প্রথম কিস্তিতে ১৬ জুন ৫০ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় কিস্তিতে ১৯ জুন এক লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের শর্ত লিখিয়ে নেওয়া হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলেও বিষয়টি নিয়ে কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর ভাগ্নে ও সোনারগাঁও প্রেসক্লাবের দপ্তর সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে মঙ্গলবার (১৬ জুন) সোনারগাঁও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, অভিযুক্তদের অব্যাহত হুমকি এবং স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টার কারণে অভিযোগ দায়ের করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সম্প্রতি মোগরাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট সাদিপুর এলাকায় এক উঠান বৈঠকে মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের ঘোষণা দেন। তবে ওই বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, বৈঠকে হাবিব নামে এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন, যাকে ঘিরে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে আরও কয়েকজন বিতর্কিত ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীদের পিছনের সারিতে অবস্থান করতে দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
উল্লেখ্য, স্থানীয় সূত্র ও এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী আরিফ হোসেন বাবু, হাবিব, আতাউর রহমান এর বাতিজা অনিক এবং কথিত বিএনপি নেতা জুয়েলকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে এলাকায় প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারে সম্পৃক্ততা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে আসছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগগুলো তদন্তসাপেক্ষ।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একদিকে মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী বক্তব্য, অন্যদিকে বিতর্কিত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উপস্থিতি জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তারা বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সোনারগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম সারোয়ার বলেন, “ঘটনার বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
শিরোনাম :
বিজ্ঞাপন :
পল্লী চিকিৎসককে মারধর, চাঁদা দাবি ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ; যুবদল নেতাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ
-
Reporter Name - Update Time : 17 June 2026, 7:40
- 18 Time View
Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট









