সময় চক্র অনলাইন ডেস্ক, বন্দর (নারায়ণগঞ্জ):
লারিজ ফ্যাশন লিমিটেডের এক নারী শ্রমিকের অকাল মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে ৩ নভেম্বর, সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। বিক্ষুব্ধ সহকর্মীদের টানা চার ঘণ্টা অবরোধে মহাসড়কের উভয় পাশে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যা জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
নিহত নারী শ্রমিকের নাম রিনা (৩০)। তিনি কারখানার সুইং সেকশনের অপারেটর ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকেরা গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, রোববার রাতে কাজ করার সময় রিনা অসুস্থ বোধ করলে তিনি কর্মরত স্টাফদের কাছে ছুটি চান। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষের কর্তব্যরত স্টাফরা তার অসুস্থতার কথায় কোনো কর্ণপাত না করে রিনাকে জোরপূর্বক কাজ করতে বাধ্য করেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হওয়ার কারণেই রিনা নামের এই নারী শ্রমিকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং পরে তিনি মারা যান। রিনা কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
রিনার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সকালে কাজে যোগ না দিয়ে লারিজ ফ্যাশনসের শত শত নারী-পুরুষ শ্রমিক বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা অমানবিক আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সকাল থেকে মদনপুর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নেমে অবরোধ শুরু করেন।
শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল— রিনার মৃত্যুর জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা এবং মৃত শ্রমিকের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে অবরোধের তীব্রতা বাড়ে। ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয়পাশে প্রায় ৫০ কিলোমিটার জুড়ে যানবাহন স্থবির হয়ে যায়, যা জনজীবনে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন বন্দর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান মহোদয়, বন্দর থানা পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং র্যাব সদস্যরা। দীর্ঘ আলোচনার পর এবং শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে প্রায় চার ঘণ্টা পর বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন। এরপর ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের অভিযোগ, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পোশাক কারখানাগুলোতে নারী শ্রমিকদের ওপর কর্তৃপক্ষের খারাপ ব্যবহার, মৌখিক ও মানসিক হয়রানি, এমনকি ছুটি না দেওয়ার প্রবণতা প্রায়শই দেখা যায়।
বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, পোশাক কারখানার বহু নারী শ্রমিকই কর্মক্ষেত্রে সুপারভাইজার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারা খারাপ দৃষ্টি, কাজের অজুহাতে শরীরে অপ্রত্যাশিত স্পর্শ কিংবা অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটি চাওয়ার পর অশালীন মন্তব্যের শিকার হন। কাজ হারানোর ভয়ে বেশিরভাগ শ্রমিকই এসব বিষয়ে অভিযোগ করতে সাহস পান না।
শ্রমিকদের দাবি, নারী শ্রমিকদের প্রতি কর্মরত কর্মকর্তাদের কঠোর দৃষ্টি (খারাপ বা উত্ত্যক্ত করার উদ্দেশ্যে দৃষ্টি দেওয়া) এবং অমানবিক ব্যবহারের সংস্কৃতি বন্ধ করে, তাদের জন্য একটি নারীবান্ধব ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শ্রমিক ও মালিকপক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি আইনগত সমাধান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং পুরো ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।








